​ সংবাদ বিভাগ | বিশেষ প্রতিবেদন ​বিদেশের মাটিতে দীর্ঘ ১২টি বছর হাড়ভাঙা খাটুনি খেটে পরিবারের মুখে হাসি ফুটিয়েছিলেন যে মানুষটি, জীবনের শেষ প্...

গভীর রাতে অসুস্থ প্রবাসী স্বামীকে রাস্তায় ফেলে গেল পরিবার: টাঙ্গাইলের সখীপুরে চাঞ্চল্য

 ​
সখীপুরে অসুস্থ প্রবাসী জামাল উদ্দিন

সংবাদ বিভাগ | বিশেষ প্রতিবেদন

​বিদেশের মাটিতে দীর্ঘ ১২টি বছর হাড়ভাঙা খাটুনি খেটে পরিবারের মুখে হাসি ফুটিয়েছিলেন যে মানুষটি, জীবনের শেষ প্রান্তে এসে তাকেই মুখোমুখি হতে হলো এক নির্মম বাস্তবতার। উপার্জনের সব অর্থ স্ত্রীর হাতে তুলে দেওয়ার পরও, মরণব্যাধি কিডনি রোগে আক্রান্ত হয়ে দেশে ফেরার পর ওই প্রবাসীকে নির্জন রাস্তায় ফেলে রেখে যাওয়ার চাঞ্চল্যকর ঘটনা ঘটেছে।

​চাঞ্চল্যকর এই মানবিক বিপর্যয়ের ঘটনাটি ঘটেছে টাঙ্গাইলের সখীপুর উপজেলার কালমেঘা গ্রামে। অসুস্থ ও অসহায় ওই প্রবাসীর নাম জামাল উদ্দিন (মৃত ফজর আলীর ছেলে)।

ঘটনার পেছনের করুণ ইতিহাস

স্থানীয় সূত্র ও স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রায় এক যুগ পূর্বে জামাল উদ্দিন তার পৈতৃক সম্পত্তি বিক্রি করে স্ত্রী রিনা আক্তারের সাথে গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার বাঁশবাড়ি এলাকায় শ্বশুরবাড়িতে বসবাস শুরু করেন। পরবর্তীতে তিনি জীবিকার তাগিদে সৌদি আরবে পাড়ি জমান।
​প্রবাস জীবনের দীর্ঘ ১২ বছরে নিজের ঘাম ঝরানো আয়ের পুরোটাই তিনি বিশ্বাস করে পাঠাতেন স্ত্রীর ব্যাংক অ্যাকাউন্টে। কিন্তু নিয়তির নির্মম পরিহাসে, প্রায় তিন মাস আগে তিনি মারাত্মক কিডনি রোগে আক্রান্ত হয়ে শারীরিকভাবে অক্ষম অবস্থায় দেশে ফিরে আসেন। হাঁটচল করার শক্তিও হারান তিনি।

গভীর রাতে রাস্তায় ফেলে রেখে প্রস্থান

অসুস্থ হওয়ার পর থেকেই জামাল উদ্দিনের চিকিৎসার ব্যয়ভার বহন করা তো দূরের কথা, তার দেখভাল করা নিয়েও স্ত্রী ও সন্তানদের মাঝে তীব্র অনিহা দেখা দেয়।
​গত শনিবার (১ আগস্ট) দিনগত গভীর রাতে স্ত্রী ও সন্তানরা মিলে অসুস্থ জামাল উদ্দিনকে সখীপুরের কালমেঘা গ্রামে তার পৈতৃক ভিটার নিকটস্থ বোনজামাইয়ের বাড়ির পাশের রাস্তায় ফেলে রেখে সটকে পড়ে। পুরো রাত ওই অসুস্থ মানুষটি খোলা আকাশের নিচে নিদারুণ কষ্টে রাস্তায় পড়ে থাকেন।
​পরদিন সকালে স্থানীয় এলাকাবাসী তাকে ওই অবস্থায় দেখতে পেয়ে ভিড় জমান। পরে বৃষ্টি শুরু হলে তার মানবিক ভাতিজি ইসমত আরা এগিয়ে আসেন এবং তাকে নিজের বাড়িতে আশ্রয় দেন।
​ইসমত আরা (ভাতিজি) জানান: "অসুস্থ চাচাকে এরকম করুণ অবস্থায় রাস্তায় পড়ে থাকতে দেখে নিজের বিবেকে লেগেছে। মানবিক কারণেই আমি তাকে আপাতত আমার বাড়িতে নিয়ে এসেছি।"

ভাই ও ছেলের বিস্ফোরক মন্তব্য

ঘটনাটি ছড়িয়ে পড়লে এলাকায় ব্যাপক ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। এ বিষয়ে জামাল উদ্দিনের ভাই আব্দুল জলিল চরম আক্ষেপ প্রকাশ করে বলেন—
"১২ বছর আগে সে সব জমি বিক্রি করে শ্বশুরবাড়ি চলে যায়। বিদেশে যাওয়ার সময় আমার কাছ থেকে চার লাখ টাকা ধার নিয়েও ফেরত দেয়নি। বিদেশে উপার্জিত সব টাকা স্ত্রীর নামেই পাঠাত। অথচ আজ চরম অসুস্থ অবস্থায় তাকে এভাবে রাস্তায় ছুড়ে ফেলে দেওয়া হলো। এটি কোনো মানুষের কাজ হতে পারে না।"
​অন্যদিকে জামাল উদ্দিনের পোশাক শ্রমিক ছেলে আবু রায়হান তার নিজের মায়ের বিরুদ্ধেই চরম ক্ষোভ উগরে দেন। তিনি বলেন—
আমি সোশাল মিডিয়ার মাধ্যমে জানতে পারি মা আমার বাবাকে রাস্তায় ফেলে এসেছে। মায়ের চারিত্রিক সমস্যা রয়েছে এবং তার সাথে আমার সম্পর্কও ভালো নয়। সামান্য বেতনের চাকরি করে আমি সংসার চালাই। কিন্তু নিজের অসুস্থ বাবার সাথে এরকম অমানুষিক আচরণ কখনোই মেনে নেওয়া যায় না। আমি মায়ের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই।

পুলিশ ও প্রশাসনের বক্তব্য

এই বিষয়ে সখীপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মুরাদ হোসেনের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি জানান—
"বিষয়টি মূলত পারিবারিক ও সামাজিক। তবে একজন অসুস্থ ও অক্ষম স্বামীকে এভাবে রাস্তায় ফেলে যাওয়া অত্যন্ত অমানবিক কাজ। স্ত্রীরও স্বামীর প্রতি আইনগত ও নৈতিক দায়িত্ব রয়েছে। এখন পর্যন্ত এ বিষয়ে কোনো লিখিত অভিযোগ পাইনি, অভিযোগ পেলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এই মানবিক বিপর্যয় নিয়ে দুটি ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি (মন্তব্য)

​🟢 পজিটিভ ও মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি:

সমাজে নৈতিক অবক্ষয়ের মাঝেও ভাতিজি ইসমত আরার মতো মানুষের উপস্থিতি প্রমাণ করে যে মানবতা এখনো পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি। যেখানে নিজের স্ত্রী ও সন্তানেরা মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে, সেখানে রক্তের সম্পর্কের এক স্বজন এগিয়ে এসে আশ্রয় দিয়েছেন। এটি আমাদের শেখায় যে বিপদের দিনে মানবিক বোধই মানুষের সবচেয়ে বড় পরিচয়।

 

​🔴 নেগেটিভ ও সামাজিক নৈতিকতার দৃষ্টিভঙ্গি:

স্বার্থপরতা ও অর্থলোভের কারণে সামাজিক ও পারিবারিক বন্ধন আজ কতটা ভঙ্গুর হয়ে পড়েছে, এই ঘটনা তার একটি নগ্ন উদাহরণ। যে ব্যক্তি সারাজীবন রক্ত পানি করে পরিবারকে ছায়া দিলেন, শেষ বয়সে অসুস্থ হয়ে পড়ার পর তাকে আবর্জনার মতো ফেলে দেওয়া হলো। এই ধরনের পারিবারিক চরম নৈতিক পতন আইনগত শাস্তির পাশাপাশি সামাজিক বয়কটের দাবি রাখে।

 

ঝাড়খণ্ডে তরুণদের নিয়োগ সংস্কারের ঐতিহাসিক সংগ্রাম: মেধাভিত্তিক ও স্বচ্ছ ব্যবস্থার নতুন প্রত্যাশা

0 comments: