বিশেষ প্রতিবেদন | গ্রামের আঙিনা থেকে ভোর হতেই যখন শহরের মানুষ গভীর ঘুমে মগ্ন, গ্রামের কৃষক তখন লাঙল-জোয়াল কাঁধে মাঠের পানে ছোটে। রোদের তাপ...

সবুজের পেছনে কৃষকের হাড়ভাঙা খাটুনি, দিন শেষে শুধুই কি দীর্ঘশ্বাস?

সবুজের পেছনে কৃষকের হাড়ভাঙা খাটুনি, দিন শেষে শুধুই কি দীর্ঘশ্বাস?

 
বিশেষ প্রতিবেদন | গ্রামের আঙিনা থেকে

ভোর হতেই যখন শহরের মানুষ গভীর ঘুমে মগ্ন, গ্রামের কৃষক তখন লাঙল-জোয়াল কাঁধে মাঠের পানে ছোটে। রোদের তাপ বাড়ার আগেই মাটিকে ফসলের উপযোগী করে তুলতে হবে। সোনালী রোদে ঝলমল করা বিশাল ধানক্ষেতের বুক চিরে যখন সবুজের ঢেউ খেলে যায়, তখন তা দেখে চোখ জুড়িয়ে যায় পুরো দেশের। কিন্তু এই মনোরম সবুজের আড়ালে ঢাকা পড়ে থাকে কৃষকের হাড়ভাঙা খাটুনি, বুকফাটা ঘাম আর না বলা শত কষ্টের গল্প।

প্রখর রোদের তাপে খালি গায়ে, কাদা-পানিতে মাখামাখি শরীরে কৃষক যখন মাটি কেটে ফসল ফলায়, তখন তা কেবল তার নিজের জীবিকা থাকে না; বরং পুরো দেশের মানুষের অন্ন সংস্থানের লড়াই হয়ে দাঁড়ায়। আধুনিক প্রযুক্তির যুগেও দেশের বহু প্রান্তিক কৃষক এখনও হাড়ভাঙা শারীরিক পরিশ্রমে মেته থাকেন। সারাদিন রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে তারা মাটিতে বীজ বোনে, কেবল এই আশায় যে—এবার হয়তো ভাগ্য ফিরবে।

কষ্টের ফসল, কিন্তু ন্যায্য মূল্য কোথায়?

কিন্তু চরম বাস্তবতা হলো—যার ঘামে দেশের মানুষের পেট ভরে, দিন শেষে তার থালাতেই টান পড়ে। ফসল তোলার মৌসুমে যখন কৃষকের মুখে হাসি ফোটার কথা, তখন বাজারে নেমে আসে চরম দরপতন। সার, বীজ, সেচ আর হাড়ভাঙা কায়িক শ্রমের যে খরচ, বাজার বিক্রির পর অনেক সময় সেই আসল মূলধনটুকুও কৃষকের হাতে ফেরে না।

এক প্রান্তিক কৃষকের আক্ষেপ:


"আমরা মাঠে রোদে পুড়ে রক্ত পানি করি, কিন্তু যখন হাটে ফসল নিয়ে যাই, তখন ক্রেতা মিলে না। আসল খরচ তো দূরের কথা, গাড়ির ভাড়াই ওঠে না। মাঝখান থেকে সব লাভ তুলে নেয় মধ্যস্বত্বভোগী আর সিন্ডিকেট। আমাদের কষ্টের দাম দেওয়ার কেউ নেই।"

এটি কেবল একজন কৃষকের একার কথা নয়; দেশের প্রতিটি গ্রামের মেহনতী কৃষকের নিত্যদিনের দীর্ঘশ্বাস। বিপণন ব্যবস্থার দুর্বলতা এবং আড়তদার-সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্যে প্রতি বছরই বোরো, আমন কিংবা রবিশস্যের ন্যায্য দাম থেকে বঞ্চিত হন মাঠপর্যায়ের প্রদেয় কারিগররা। ফলে দেনার দায়ে জর্জরিত হয়ে অনেক কৃষকই হারাচ্ছেন চাষাবাদের শেষ সম্বলটুকু।

সংকট নিরসনে সরকারের ভূমিকা ও আশু করণীয়

কৃষিই আমাদের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি, আর কৃষক সেই চালিকাশক্তির প্রাণ। তাই কৃষকের এই ধারাবাহিক লোকসান ও হতাশা দূর করতে অবিলম্বে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরি।

সিন্ডিকেট বিলোপ: বাজার থেকে মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য বন্ধ করে কৃষকের কাছ থেকে সরাসরি ধান ও ফসল ক্রয়ের ব্যবস্থা জোরদার করা।

ন্যায্য মূল্য নির্ধারণ: ফসলের উৎপাদন খরচের সাথে সামঞ্জস্য রেখে সরকারিভাবে নির্ধারিত সাপোর্ট প্রাইস বা সর্বনিম্ন মূল্য কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করা।

ভর্তুকি ও ঋণ সহায়তা: প্রান্তিক কৃষকদের হাতে সহজ শর্তে সুদমুক্ত কৃষি ঋণ এবং সার-বীজের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ পৌঁছে দেওয়া।

কৃষক বাঁচলে বাঁচবে দেশ। তাদের হাড়ভাঙা খাটুনির পর হাসিমুখে ঘরে ফেরার অধিকারটুকু ফিরিয়ে দেওয়া এখন সময়ের দাবি।

0 comments: